শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৯ পূর্বাহ্ন

গণপূর্ত প্রকৌশলী এ. কে. এম. সোহরাওয়ার্দ্দীর বিরুদ্ধে কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

সামজীদ হোসেন
  • প্রকাশ সময় : সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫

সামজীদ হোসেন: ঢাকায় গেড়ে বসা গণপুর্ত অধিদপ্তরের প্রভাবশালী প্রায় সব কর্মকর্তাদের ঢাকার বাহিরে বদলি করা হলেও ঢাকার বাহিরে বদলি করা হয়নি প্রকৌশলী এ. কে. এম. সোহরাওয়ার্দ্দীকে। প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি আছেন ঢাকাতেই। এই ১৬ বছর ধরে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরে গড়ে তুলেছেন প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট। এছাড়াও তিনি পতিত হাসিনা সরকারের আমলে গণমাধ্যমেও কৌশলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জনসংখ্যা প্রকল্প কোষ (পিপিসি) ছাড়াও গণপূর্ত পেকু সার্কেলের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ আছে, সোহরাওয়ার্দ্দী পিপিসি-তে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বরাদ্দের কাজে বরাদ্দ বেশি দেয়ার নামে সারাদেশের নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েক হাজার কোটি টাকার চলমান উন্নয়ন প্রকল্প হতে কোটি ভেরিয়েশন দিয়েও মোটা অংকের কমিশণ হাতিয়ে নিয়েছেন।
জানা যায়, তিনি ২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার এর আগমনের সাথে সাথেই শেরেবাংলানগর-১ এ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। শেখ রেহানার আশীর্বাদে প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসেই তার অনুগত সোহরাওয়ার্দ্দীকে নিজের স্টাফ অফিসার করেন। সোহরাওয়ার্দ্দী এই পদে বসার পরেই গণপূর্তে টেন্ডার মাফিয়াখ্যাত ঠিকাদার জিকে শামীমের সহযোগী সাবেক স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা মোল্লা মোহাম্মদ কাউসার, যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট, বগা লিটন, জনি এদের আনা গোনাতে মুখর থাকত তার রুম। পরে রফিক প্রধান প্রকৌশলী হলে সোহরাওয়ার্দ্দী আরো ক্ষমতাধর হয়ে উঠেন। এসময় তিনি মূলত ডিফেক্টো চীফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।
এছাড়াও আওয়ামী শাসনের সবচেয়ে আশীর্বাদপুষ্ট আমলা পূর্ত-সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার গং-এর সাথে তিনি সখ্যতা গড়ে তোলেন। শহিদুল্লাহ, রফিক ও তৎকালীন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ মিলে একটি দূর্নীতির নেক্সাস গড়ে তোলেন। এই নেক্সাস মিলে পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার অপ্রয়োজনীয় আবাসিক প্রকল্প বানিয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছেন। তারা একাধিকবার সিঙ্গাপুরে গিয়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার সামিট গ্রুপকে দিয়ে এসেছেন। রফিকের হয়ে সমস্ত দেন দরবার সোহরাওয়ার্দীই করতেন বলে জানা যায়।
পরে ক্যাসিনো কান্ডে জিকে শামীম গ্রেফতার হলে সোহরাওয়ার্দ্দীসহ আরও ছয় প্রকৌশলীর টেন্ডার নিয়ন্ত্রনে সংশ্লিষ্টতা খুজে পায় দুদক। কিন্তু তিনি কোটি টাকার বিনিময়ে দুদক থেকে দায় মুক্তি নিয়ে নেন। জানা যায়, শেখ সেলিমের সহযোগীতায় তিনি ঢাকা সার্কেল-১ এ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চেয়ারে বসেন। রফিকের পরে শাহাদাত প্রধান প্রকৌশলী হলে সোহরাওয়ার্দ্দীর ক্ষমতা আরো বেরে যায়। কিন্তু ২০২০ সালে আশরাফুল আলম প্রধান প্রকৌশলী হলে তার সঙ্গে বদলী বানিজ্য ও মিডিয়া সিন্ডিকেট নিয়ে ব্যক্তিত্বের সংঘাত ঘটে। আশরাফ তাকে দিনাজপুর সার্কেলে বদলী করলেও তিনি সেখানে যোগদান করেননি এবং একদিনের জন্যও যাননি। উল্টো আশরাফের বিরুদ্ধে মিডিয়া লেলিয়ে দেন। ফলে আশরাফ সেই অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হন। সে যাত্রায় তিনি নিরাপদ প্রস্থান হিসেবে পিপিসি এর পোস্টিং বেছে নেন। সেখানে টাকা কামিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। শামীম আখতার চীফ ইঞ্জিনিয়ার হলে তিনি আবার মিডিয়া নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব নিয়ে নেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি বিএনপি ঘরানার অফিসারদের ইচ্ছেমতো বানোয়াট রিপোর্ট করিয়ে হয়রানি করিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
অভিযোগ আছে, জিকে শামীম গ্রেফতার হলে তিনি টেন্ডারের নিয়ন্ত্রন নিতে অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স ম্যান খ্যাত জেনারেল আজিজের ভাই জোসেফ, হারিস ও জিসানের সহায়তা নেন। তার বাড়ি চাদপুর হওয়ায় আজিজ পরিবারের সাথে তার আগে থেকেই সখ্যতা ছিলো। জেনারেল আজিজের ক্ষমতাতে তিনি নিজের প্রয়োজনে একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করতেন।
শামীম আখতার প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর তিনি শামীম আখতারের ঘনিষ্ট সহচর নূসরাত হোসেনের সাথে মিলে বড় ঠিকাদারদের নিয়ে কন্ট্রাক্ট নিগোসিয়েশন করতেন। এভাবে তিনি শামীম আখতারের আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। পরে শামীম আখতার তাকে সাভার সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করেন। সে সময়ে সাভার সার্কেলের আওতায় বিশেষত মিরপুরে তিনি চুন্নুকে সাথে নিয়ে এগার হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিগোশিয়েসন করেছেন বলে অভিযোগ আছে।
পরবর্তীতে মিরপুরে রাশেদ এলেও তার পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় ছিল। খ্যাদ্য মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ফার্ম নূরানী কন্সট্রাকশন, ফার্ম দেশ উন্নয়ন, ডেল্টা, বঙ্গ বিল্ডার্স, ওয়াহিদ মিয়া, স্টার লাইট, স্পেক্ট্রা, দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স, এন ডি ই লিঃ, কুশলী নির্মাতা, দ্য ইঞ্জিনিয়ারস এন্ড আর্কিটেক্ট এসব প্রতিষ্ঠানের গণপূর্তে কাজ পাওয়ার পেছনে সোহরাওয়ার্দ্দীর হাত রয়েছে বলে জানা যায়। এভাবে টেন্ডারবাজি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা।
হাসিনা সরকারের পতনের পরে এ. কে. এম. সোহরাওয়ার্দ্দী আবারো সেই পুরানো পিপিসিতেই সেইফ এক্সিট নিয়ে ধরা ছোয়ার বাহিরে থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প থেকে কয়েক কোটি টাকা লোপাট করছেন বলে গণপূর্ত সংশ্লিষ্টরা জানান। গণপূর্ত সংশ্লিষ্টরা তাকে রুপার্ড মার্ডক অফ পিডব্লিউডি বলেও অভিহিত করেন।
এবিষয়ে জনসংখ্যা প্রকল্প কোষ (পিপিসি)-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ. কে. এম. সোহরাওয়ার্দ্দী-এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: মোঃ নাহিন খান
raytahost-tmnews71